X

মায়ের কাছে মামাবাড়ীর গল্প

May 18, 2011 by Ripon Majumder   Comments (0)

social

আপনি জানেন কি?

আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ল্যাংকেস্টার কাউন্টিতে একটি জায়গা আছে যেখানে বিদ্যুৎ নাই, লোকজন হারিকেন জ্বালিয়ে থাকে; ফ্যান নাই, হাতপাখা ব্যবহার করে। আধুনিক যন্ত্রচালিত কোনপ্রকার গাড়ী ব্যবহার করে না। প্রত্যেক পরিবারেরই একটি করে ঘোড়া-চালিত ওয়াগন আছে।

তাদের পোশাক পরিচ্ছদ
তারা নিজেদের ঘরে বানানো প্লেইন ফেব্রিক্সের পোশাক পরিধান করে । মেয়েরা সাধারণত তাদের চুল কাটে না। ছেলেদের গোফ রাখা নিষেধ এবং বিয়ের পর সাধারণত দাড়ি বড় করে। ছেলেদের টাই, বেল্ট পরাও নিষেধ।

পেশা
তাদের প্রধান পেশা কৃষি। এছাড়া কেউ কেউ কার্পেন্টার, কামার, কুমার। এরা নিজেদের ফসলাদি নিজেরা জন্মায়। অতিরিক্ত দ্রব্যাদি সুপারমার্কেটে (ডিপার্টমেন্টাল স্টোর) বিক্রী করে। ঘোড়া তাদের পারিবারিক ট্রেডমার্ক। ফসল ফলানো থেকে শুরু করে যাতায়াতের কাজে ঘোড়াই ব্যবহার করা হয়।

বিদ্যুৎ বিমুখ
এরা আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। কেরোসিন অথবা গ্যাসবাতি ব্যবহার করে রাতে ঘরে আলো তৈরী করে, রান্নার কাজে ব্যবহার করে কাঠ, কেরোসিন অথবা প্রোপেন। শীতের সময়ে কাঠ অথবা কয়লা জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখে।
আমাদের মা- খালাদের মতো এক মাথা থেকে আরেক মাথায় রশিতে করে কাপড় শুকায়। ওয়াশার-ড্রাইয়ার ব্যবহার করে না।

শিক্ষাদীক্ষা
তাদের জীবন যাপনের এই চ্যাপ্টারটা বেশ মজার।
তারা নিরক্ষর নয়, শিক্ষায় বিশ্বাসী তবে সেটা শুধুমাত্র অষ্টম গ্রেড পর্যন্ত। এক রুমের স্কুলঘরে লেখাপড়া করে। সেখানে পড়া, লেখা, বানান করা, ভূগোল, অঙ্ক এবং ইংলিশ ও জার্মান ভাষা শেখানো হয়। প্রতিটি স্কুলে গড়ে মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকে। বাড়ীঘরের মতো স্কুলগুলোও তারা নিজেরাই তৈরী করে। স্কুল তৈরী করা হয় সকলের জন্য হাঁটা-দূরত্বে। সেখানে শুধু ম্যাডামরাই পড়ায়। ম্যাডামকে বয়সে যুবা এবং অবিবাহিত হতে হবে। শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতার সমন্বয়ে গঠিত লোকাল স্কুল বোর্ড” শিক্ষক নির্বাচন করে।
যাই হোক, অষ্টম গ্রেড পর্যন্ত অর্থাৎ এটুকু পড়াশোনাই তারা জীবন চলার জন্য যথেষ্ট মনে করে। তারা মনে করে বেশী পড়াশুনা করলে জীবন জটিল হয়ে যায়, লোকজনদের দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়তে হয়। তারা মনে করে জীবনযাপনের জন্য ন্যুনতম যতটুকু শিক্ষার দরকার- এর অর্ধেকটা মাত্র আসে শ্রেণীকক্ষের শিক্ষা থেকে। বাকী অর্ধেক আসে চাষাবাদ ও বাড়ীঘর তৈরীর হাতে কলমে কাজ থেকে। তাই অষ্টম গ্রেড পর্যন্ত পড়াশোনার পর তাদের ভোকেশনাল স্কুলিং শুরু হয়ে যায়। যাকে বলা হয়, হাতে-কলমে শিক্ষা। সপ্তাহে একদিন তারা বাপ-দাদার চাষাবাদ শেখে। পৈত্রিক ব্যবসা থাকলে ব্যবসা শিখে। পাশাপাশি মেয়েরাও তাদের মা-খালাদের নিকট থেকে গৃহস্থালির কাজ শিখতে থাকে। অর্থাৎ ছেলেদের ট্যাগ করে দেয়া হয় বাপ-দাদার সাথে। মেয়েদের ট্যাগ করা হয় মা-খালাদের সাথে।
প্রতি পরিবারে গড়ে ৭/৮ সন্তানের প্রত্যেককেই অষ্টম গ্রেড পার হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের অর্থনীতিতে বাধ্যতামূলকভাবে কোন না কোন অবদান রাখতে হয়। পরোক্ষ কোন অবদান নয়, প্রত্যক্ষ অবদান। আমাদের মতো আড্ডা মারার সুযোগ নেই।
আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট ১৯৭২ সালে এ শিক্ষাব্যবস্থা অনুমোদন করেছে এবং বলে দিয়েছে, উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য তাদের উপর জোর খাটানো যাবে না।

ধর্মকর্ম
আমিষরা ধার্মিক। বাইরের বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে সহজ-সরল জীবন যাপন করে, তারা আত্ম-নির্ভরশীল তাই সরকারের কাছ থেকে কোনরূপ সাহায্য নেয় না।

অহিংস
তারা কোনরকম ভায়োলেন্সে বিশ্বাসী নয়, তাই তারা কখনো মিলিটারীতেও যায় না।

বিয়ে শাদী
তারা ১৬ বছর হবার পর থেকেই নিজেদের জন্য পাত্র-পাত্রী খোঁজা শুরু করে। ২০ বছর বা তার আগেই তারা বিয়ে করে ফেলে।
তাদের বিয়েতে দীর্ঘমেয়াদী অনুষ্ঠান হয়, আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে, বিশাল ভোজের ব্যবস্থা হয়। তবে বিয়ের কন্যা কোনরকম আড়ম্বরপূর্ণ পোশাক পরে না, কোনরূপ মেকাপ বা অলংকার পরে না বা কোনরূপ ফটোগ্রাফীর ব্যবস্থাও নেই।
পোষাকে কোনপ্রকার বোতাম থাকবে না, বোতামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হবে হুক্‌। “প্লেইন লাইফষ্টাইল” বলে কথা।

বংশবিস্তার
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, আমিষরা পরিবার পরিকল্পনায় বিশ্বাসী নয়। প্রতিটা পরিবারের গড়ে কমপক্ষে সাতজন ছেলেমেয়ে থাকে।

অসুখ বিসুখ
একই গোত্রে বিয়ে শাদী ও বংশ বিস্তার সীমাবদ্ধ বলে তাদের মধ্যে জেনেটিক অসুখ-বিসুখের প্রকোপ বেশি।

অন্যান্য
নিজেদেরকে ডিসপ্লে করতে পছন্দ করে না। অন্যরা তাদের ফটো তুলুক- তা চায় না। ট্যুরিষ্টরাও সৌজন্যবোধের খাতিরে তাদের ফটো তুলে না। এ প্রসঙ্গে ইংরেজিতে চমৎকার একটা কথা দেখলাম, They want to be remembered by the lives they lived and the examples they left, not by physical appearance. বাংলা করলে দাঁড়ায় অনেকটা এরকম, নির্দিষ্ট কারও শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে নয়, সাধারণ জীবনযাপন দিয়ে তারা অতি সাধারণ দর্শন রেখে যায়।
নিজেদের চার্চ, স্কুল ঘর বা বাস করার ঘর-দুয়ার নিজেরাই তৈরী করে। তৈরী করার সময় পরিবারের/ কম্যুনিটির সকল সদস্য একটা ইউনিট হিসেবে কাজ করে।
স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য তারা গর্ববোধ করে। সরকারের নিকট থেকে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বা বেকার ভাতা তথা কোনরূপ ভাতা গ্রহণ করে না। ঝড় বা অগ্নি দূর্ঘটনা অর্থাৎ প্রাকৃতিক কোন দূর্যোগে ব্যবহারের জন্য তাদের নিজস্ব চার্চে তারা নিজস্ব ফান্ড গড়ে তোলে। অথচ অন্যান্য নাগরিকদের মতো তারা সরকারকে সকল কর পরিশোধ করে।

আবাস নিবাস
যেখানে তারা বাস করে সেখানটাকে আমিষ কান্ট্রি/আমিষ ভিলেজ (Amish Country) বলা হয় এবং গোত্রের লোকজনদের বলা হয় আমিষ পিপল্‌।
আমিষদের উৎপত্তি ইউরোপে অ্যানাব্যাপটিস্ট (Anabaptists) গোত্র থেকে। ১৬০০ সালের দিকে জ্যাকব আম্মান (Jacob Ammann) নামে এক অ্যানাব্যাপটিস্ট তার কিছু অনুসারী নিয়ে নিজ গোত্র থেকে আলাদা হয়ে আমিষ গোত্র শুরু করেন।
আমিষদের প্রথম দলটি আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ল্যাংকেস্টার কাউন্টিতে আসে ১৭৩০ সালে। বর্তমানে আমিষ লোকজন ওহাইও, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, কানাডার ওন্টারিওতে ছড়িয়ে পড়লেও বিশাল একটি (অনেকের মতে বেশীরভাগ) দল ল্যাংকেস্টার কাউন্টিতেই বাস করে ।

সমগ্র নর্থ আমেরিকাতে আমিষদের সংখ্যা হবে প্রায় ২৫০,০০০।

This is a test transmission -- Bangladesh Online Radio.